Home / Blog / খাদ্যনালীর ক্যান্সারের কারণ, লক্ষণ ও চিকিৎসা
খাদ্যনালীর ক্যান্সার একটি গুরুতর রোগ, যা খাদ্যনালীর কোষে অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণে সৃষ্টি হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে চিকিৎসা অনেকটাই সম্ভব, কিন্তু দেরি হয়ে গেলে জটিলতা দ্রুত বাড়তে থাকে।
খাদ্যনালী হলো মুখ থেকে পাকস্থলী পর্যন্ত খাবার বহন করার দীর্ঘ নলাকার অঙ্গ। এর কোষগুলোতে জেনেটিক পরিবর্তন ঘটলে ক্যান্সার শুরু হয়, যা সাধারণত দীর্ঘস্থায়ী জ্বালা বা ক্ষতির ফলে ঘটে থাকে।
খাদ্যনালীর ক্যান্সার প্রধানত দুই ধরনের — স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমা (খাদ্যনালীর উপরের অংশে) এবং অ্যাডেনোকার্সিনোমা (নিচের অংশে)। বাংলাদেশে ধূমপান এবং দীর্ঘস্থায়ী জিইআরডি (GERD)-এর কারণে এই রোগ ক্রমশ বাড়ছে।
প্রধান ঝুঁকির কারণ
খাদ্যনালীর ক্যান্সারের একটি নির্দিষ্ট কারণ এখনও সম্পূর্ণ জানা যায়নি, তবে ধূমপান এবং অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবন সবচেয়ে বড় দায়ী। এই দুটো অভ্যাস একসাথে থাকলে ঝুঁকি প্রায় ১০ গুণ পর্যন্ত বেড়ে যায়, বিশেষ করে স্কোয়ামাস ধরনের ক্যান্সারের ক্ষেত্রে।
জিইআরডি এবং ব্যারেটস এসোফ্যাগাস
গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ (GERD) থেকে বারবার অ্যাসিড রিফ্লাক্স হলে খাদ্যনালীর ভেতরের আস্তরণ ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে থাকে। এই অবস্থাকে বলা হয় ব্যারেটস এসোফ্যাগাস, যা একটি প্রাক-ক্যান্সারাস অবস্থা এবং অ্যাডেনোকার্সিনোমার ঝুঁকি ৩০ থেকে ৪০ গুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়। দীর্ঘদিন অ্যাসিডিটির সমস্যা থাকলে এই ঝুঁকি আরও বাড়ে।
খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাত্রা
অতিরিক্ত গরম চা বা কফি পান করা, বেশি মসলাদার খাবার খাওয়া, এবং ফল ও সবজি কম খাওয়া খাদ্যনালীর ক্ষতি করতে পারে। অতিরিক্ত ওজন এবং অ্যাকালাসিয়া (খাদ্যনালীর মাংসপেশীর দুর্বলতা) ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়। বাংলাদেশে ধূমপানের পাশাপাশি এই অভ্যাসগুলো অনেকের মধ্যেই দেখা যায়।
অন্যান্য ঝুঁকির কারণ
শিল্পকর্মে দীর্ঘদিন পরিবেশগত রাসায়নিকের সংস্পর্শে থাকা, হেপাটাইটিস বি/সি, বা আগে রেডিয়েশন থেরাপি নেওয়া হলেও ঝুঁকি বাড়ে। পুরুষদের মধ্যে এই ক্যান্সার নারীদের তুলনায় ৩ থেকে ৪ গুণ বেশি দেখা যায়, বিশেষ করে ৫০ বছরের পরে।
প্রাথমিক লক্ষণ
শুরুতে সাধারণত হজমের সমস্যা, বদহজম, বা অ্যাসিড রিফ্লাক্সের মতো লক্ষণ দেখা দেয়। গলায় কিছু আটকে থাকার ভাব বা শুকনো লাগার অনুভূতিও হতে পারে। এগুলো অনেকে সাধারণ সমস্যা ভেবে উপেক্ষা করেন, যার ফলে রোগ ধীরে ধীরে পরবর্তী পর্যায়ে চলে যায়।
গিলতে অসুবিধা (ডিসফ্যাগিয়া)
ডিসফ্যাগিয়া বা গিলতে কষ্ট হওয়া খাদ্যনালীর ক্যান্সারের সবচেয়ে পরিচিত লক্ষণ। প্রথমে শক্ত খাবার গিলতে অসুবিধা হয়, পরে তরল খাবারেও সমস্যা দেখা দেয়। টিউমার বাড়তে থাকলে খাদ্যনালী সংকুচিত হয়, এবং বুকে ব্যথা বা জ্বালাপোড়াও যোগ হয়।
উন্নত পর্যায়ের লক্ষণ
রোগ বাড়লে হঠাৎ ওজন কমে যাওয়া, রাতে কাশি, বমিতে রক্ত, কালো মল, বা গলা থেকে রক্ত আসার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। কণ্ঠস্বর বদলে যাওয়া বা শ্বাসকষ্ট হলে সেটা সাধারণত চতুর্থ পর্যায়ের ইঙ্গিত। বাংলাদেশে অনেকে এই লক্ষণগুলো দীর্ঘদিন উপেক্ষা করে দেরিতে ডাক্তারের কাছে যান।
প্রাথমিক পরীক্ষা
প্রথমে শারীরিক পরীক্ষার পর ডাক্তার এন্ডোস্কোপি করেন, যাতে সরাসরি খাদ্যনালীর ভেতর দেখা যায় এবং প্রয়োজনে বায়োপ্সি নেওয়া হয়। ব্যারিয়াম সোয়্যালো টেস্ট খাদ্যনালীর আকৃতি ও সংকোচন পরীক্ষা করতে ব্যবহার করা হয়।
অগ্রসর পরীক্ষা
সিটি স্ক্যান, পিইটি স্ক্যান, বা এন্ডোআলট্রাসাউন্ড ক্যান্সার কতটা ছড়িয়েছে তা নির্ধারণ করে। এই পরীক্ষাগুলো স্টেজিং-এর জন্য অত্যন্ত জরুরি (পর্যায় ০ থেকে ৪)। দীর্ঘদিন জিইআরডিতে ভোগা রোগীদের জন্য নিয়মিত স্ক্রিনিং উপকারী হতে পারে।
প্রাথমিক পর্যায়ে এসোফ্যাজেকটমি (খাদ্যনালীর একটি অংশ অপসারণ) করা হয়। আরও জটিল ক্ষেত্রে এসোফাগোগ্যাস্ট্রেকটমিতে পেটের অংশও অপসারণ করতে হয়। মিনিমালি ইনভেসিভ বা ল্যাপারোস্কোপিক পদ্ধতিতে করলে রিকভারি তুলনামূলক দ্রুত হয়।
ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করতে কেমোথেরাপি ব্যবহার করা হয়, যা সার্জারির আগে (নিওঅ্যাডজুভেন্ট) বা পরে (অ্যাডজুভেন্ট) দেওয়া হয়। সিসপ্ল্যাটিন এবং ৫-ফ্লুরোরাসিল-এর মিশ্রণ সাধারণত ভালো ফল দেয়। সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মধ্যে আছে বমি, চুল পড়া, এবং ক্লান্তি।
উচ্চ-শক্তির রশ্মি টিউমার ছোট করতে সাহায্য করে। কেমোথেরাপির সাথে একসাথে দেওয়া হলে এটি কেমোরেডিয়েশন নামে পরিচিত। আইএমআরটি পদ্ধতিতে আরও নির্ভুলভাবে রেডিয়েশন দেওয়া সম্ভব।
HER2 পজিটিভ ক্যান্সারে ট্রাস্টুজুমাব এবং VEGF ব্লক করতে রামুসিরুমাব ব্যবহার হয়। পেমব্রোলিজুমাব (PD-1 ইনহিবিটর) ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করে ক্যান্সারের বিরুদ্ধে কাজ করতে সাহায্য করে। উন্নত পর্যায়ের ক্যান্সারে এটি বেশ কার্যকর।
প্রাথমিক পর্যায়ের ক্যান্সারে ফটোডায়নামিক থেরাপি বা মাল্টিপোল ইলেকট্রোকোয়াগুলেশন (MRD)-এর মাধ্যমে টিউমার পুড়িয়ে ফেলা হয়। এটি তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ একটি পদ্ধতি।
পর্যায় ০-১ (খাদ্যনালীর সীমিত অংশে): এন্ডোস্কোপিক অপসারণ বা সার্জারি। পর্যায় ২-৩ (আশেপাশে ছড়িয়েছে): কেমোরেডিয়েশনের পর সার্জারি। পর্যায় ৪ (দূরবর্তী অঙ্গে ছড়িয়েছে): প্যালিয়েটিভ কেমো বা ইমিউনোথেরাপি।
প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে সাফল্যের হার প্রায় ৯০%, কিন্তু উন্নত পর্যায়ে এটি মাত্র ২০ থেকে ৩০ শতাংশে নেমে আসে।
খাদ্যনালীর ক্যান্সার প্রতিরোধযোগ্য, এবং প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে চিকিৎসাও সম্ভব। যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে ডাক্তার দেখান। স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা মেনে চললে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো যায়। বিস্তারিত জানতে সবসময় একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
১. খাদ্যনালীর ক্যান্সারের প্রথম লক্ষণ কী?
শুরুতে সাধারণত বদহজম, অ্যাসিড রিফ্লাক্স, এবং গলায় কিছু আটকে থাকার মতো অনুভূতি দেখা দেয়। পরে গিলতে কষ্ট হওয়া (ডিসফ্যাগিয়া) সবচেয়ে পরিচিত লক্ষণ হিসেবে দেখা যায়।
২. কাদের খাদ্যনালীর ক্যান্সারের ঝুঁকি বেশি?
ধূমপায়ী, অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবনকারী, দীর্ঘদিন জিইআরডিতে ভোগা রোগী, এবং ৫০ বছরের বেশি বয়সী পুরুষদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
৩. খাদ্যনালীর ক্যান্সার কি প্রতিরোধ করা সম্ভব?
সম্পূর্ণ প্রতিরোধ সম্ভব না হলেও ধূমপান ছেড়ে দেওয়া, অ্যালকোহল কমানো, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস মেনে চলা, এবং জিইআরডির সঠিক চিকিৎসা করালে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো যায়।
৪. ব্যারেটস এসোফ্যাগাস কি ক্যান্সারে পরিণত হয়?
ব্যারেটস এসোফ্যাগাস নিজে ক্যান্সার নয়, তবে এটি একটি প্রাক-ক্যান্সারাস অবস্থা। সঠিক পর্যবেক্ষণ ও চিকিৎসা না হলে এটি অ্যাডেনোকার্সিনোমায় রূপান্তরিত হতে পারে।
৫. খাদ্যনালীর ক্যান্সার নির্ণয়ে কোন পরীক্ষা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ?
এন্ডোস্কোপি ও বায়োপ্সি প্রাথমিক নির্ণয়ের জন্য সবচেয়ে কার্যকর। ক্যান্সার কতটা ছড়িয়েছে তা জানতে সিটি স্ক্যান বা পিইটি স্ক্যান করা হয়।
৬. প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু?
পর্যায় ০ বা ১-এ ধরা পড়লে সাফল্যের হার প্রায় ৯০ শতাংশ। কিন্তু চতুর্থ পর্যায়ে গেলে এই হার মাত্র ২০ থেকে ৩০ শতাংশে নেমে আসে, তাই লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত ডাক্তার দেখানো অত্যন্ত জরুরি।
Get all the latest updates easily